এক ন্যায়পূর্ণ জগতের জন্য আপনি কি আকুল আকাঙ্ক্ষী?
তিনটি মাস্তুল ও দুটি পাটাতন যুক্ত একটি কাঠের পালতোলা জাহাজ সেই উপকূলে পৌঁছায় যা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেপ কোড নামে পরিচিত। জাহাজের নাবিক ও ১০১ জন যাত্রী ৬৬ দিন ধরে সমুদ্রযাত্রা করায় পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। ধর্মীয় তাড়না ও অর্থনৈতিক কষ্ট থেকে মুক্তি খোঁজার জন্য তারা আটলান্তিক মহাসাগর পাড়ি দিতে এক দুঃসাধ্য যাত্রা করেছেন।
যখন ১৬২০ সালের ১১ই নভেম্বর মেফ্লাওয়ার নামক এই জাহাজের যাত্রীরা স্থলভূমি দেখতে পায়, তাদের চোখ এক নতুন আরম্ভের আশায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এক উত্তম জগতের ভিত্তি স্থাপনের আকাঙ্ক্ষায়, জাহাজের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যাত্রীরা মেফ্লাওয়ার চুক্তিতে সাক্ষর করেন। এটিতে তারা “উপনিবেশের সার্বজনীন মঙ্গল” এর জন্য “ন্যায়পূর্ণ ও নিরপেক্ষ আইন” বিধিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে একমত হন। নৈতিকভাবে উন্নত ও সকলের জন্য পক্ষপাতহীন একটি জগৎ সম্বন্ধে তাদের স্বপ্ন—একটি ন্যায়পূর্ণ জগৎ—কি বাস্তবে পরিণত হবে?
যদিও মেফ্লাওয়ার-এ কৃত চুক্তিপত্রে সাক্ষরকে মার্কিন সরকারি ব্যবস্থার এক অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে বিবেচনা করা হয় তবু আমেরিকার জন্যও অবিচার এক সাধারণ ঘটনা, যেমন এটি সারা পৃথিবীব্যাপী বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, সেই ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন যাকে উদ্দেশ্য করে পুলিশ গুলি করেছিল যখন সে ডাকাতি ও দোকানের মালিককে গুলি করে পালাচ্ছিল। সে পুলিশ ও নিউ ইয়র্ক শহরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করে আর বিষয়টির মীমাংসাতে লক্ষ লক্ষ ডলার লাভ করে।
আর একটি উদাহরণ বিবেচনা করুন। যখন আইন বিদ্যালয়ের ছাত্রেরা ক্যালিফোর্নিয়ার পাশাডেনায় ওকালতির পরীক্ষা দিচ্ছিল তাদের একজন হঠাৎ অসুস্থ হয় ও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। পাশের দুজন ছাত্র, চিকিৎসা সহায়ক দলটি না পৌঁছান পর্যন্ত তৎপরতার সাথে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার জন্য বুকে চাপ দেওয়া ও মালিশ করার পদ্ধতি প্রয়োগ করে। তারা সেই ব্যক্তিটিকে সাহায্য করার জন্য ৪০ মিনিট ব্যয় করে। কিন্তু যখন তারা পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ক্ষতিপূরণমূলক অতিরিক্ত সময়ের জন্য অনুরোধ করে তখন পরীক্ষা আধিকারিক তা প্রত্যাখ্যান করেন।
অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য শাস্তির বিষয়টিও বিবেচ্য। অর্থনীতি বিশ্লেষক এড রুবেনস্টাইন নির্দেশ করেন: “অধিকাংশ অপরাধগুলির ক্ষেত্রে কখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয় না। যাদের গ্রেপ্তার করা হয় তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয় না। অনেক দণ্ডিত অপরাধীদের শর্তাধীনে ছেড়ে দেওয়া হয়। অপরাধীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে প্রত্যাশিত শাস্তি পাওয়া হল এক সম্ভাবনা, একটি নিশ্চিত বিষয় নয়।” সিঁদ কেটে চুরি করার পরিসংখ্যান ব্যবহার করে তিনি উপসংহার করেন যে এক কুশলী সিঁদেল চোর “৯৮ শতাংশেরও বেশি বার জেলে যাওয়া থেকে বেঁচে যাবে।” শাস্তির এই কম ঝুঁকি আরও বেশি অপরাধ ও অপরাধের শিকার হওয়ার প্রতি পরিচালিত করে।—উপদেশক ৮:১১.
অনেক দেশগুলিতে এক অল্পসংখ্যক ধনী ব্যক্তিরা ক্রমাগত ধনী হয়ে চলেছে যখন দরিদ্র জনসাধারণ অর্থনৈতিক অবিচারের সম্মুখীন হয়ে থাকে। এইধরনের অন্যায়ের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় যখন লোকেরা তাদের বর্ণ, জাতিগত পটভূমি, ভাষা, লিঙ্গ অথবা ধর্মের কারণে তাদের অবস্থার উন্নতি করা অথবা এমনকি নিজেদের প্রতিপালন করার জন্য কমই অনুকূল সুযোগ পেয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, নিউ ইয়র্ক টাইমস্ অনুসারে, “হিন্দু ধর্ম অধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়ায়—যার অধিকাংশই ভারত ও নেপালের অন্তর্গত—প্রায় ২৫ কোটি লোক অস্পৃশ্য হিসাবে জন্মগ্রহণ করে ও মারা যায়।” পরিণাম হল কোটি কোটি লোকেরা দারিদ্র, ক্ষুধা এবং রোগ দ্বারা পীড়িত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবিচার তাদের জীবনকে পরিব্যাপ্ত করে।
কিছু প্রতীয়মান অবিচার সম্বন্ধে কী বলা যায় যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে? সেই শিশুদের কথা চিন্তা করুন যারা সহজাত অঙ্গবিকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে—যেমন অন্ধ, জড়বুদ্ধি অথবা বিকলাঙ্গ হয়ে। একজন স্ত্রীলোক কি এটিকে অবিচার বলে বোধ করবেন না যখন তার শিশু বিকলাঙ্গ অথবা মৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে আর তার পাশের স্ত্রীলোকেরা স্বাস্থ্যবান শিশুকে বুকে জড়িয়ে আদর করে?
দুঃখের বিষয় যে, অবিচার এবং এর পরিণামও ব্যাপক—দুঃখকষ্ট অপরিমেয় আর শান্তি, আনন্দ ও পরিতৃপ্তির অভাব রয়েছে। অবিচারের প্রত্যক্ষদর্শী অথবা তা ভোগ করার দ্বারা অতিষ্ঠ হয়ে অনেকে হিংস্রতার পথ অবলম্বন করেছে যা কেবলমাত্র মনুষ্য কষ্টভোগকেই বাড়িয়ে তুলেছে। অধিকাংশ যুদ্ধগুলি প্রত্যক্ষ অবিচারের কারণেই সংঘটিত হয়েছে।
কেন মানুষ একটি ন্যায়পূর্ণ জগৎ নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে? এইধরনের এক জগৎ কি কেবলমাত্র একটি স্বপ্ন?
[৩ পৃষ্ঠার চিত্র সৌজন্যে]
Corbis-Bettmann
[৪ পৃষ্ঠার চিত্র]
মেফ্লাওয়ার চুক্তিতে সাক্ষর
[সজন্যে]
Corbis-Bettmann