অত্যন্ত অসাধারণ এক বিবাহোৎসব
মোজাম্বিকের উত্তরাঞ্চলে সুন্দর পাহাড়গুলি দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি উর্বর উপত্যকা রয়েছে—এগুলির কিছু পাথুরে আবার অন্যগুলি প্রচুর সজীব গাছপালায় পূর্ণ। এইখানেই ফিঙ্গোয়ে গ্রামটি অবস্থিত। শীতের পরিষ্কার রাতে, তারকাপূর্ণ আকাশ জ্বলজ্বল করে আর চাঁদ এত উজ্জ্বল যে এটি গ্রামবাসীদের খড়ের গৃহগুলির চালকে আলোকিত করে। এই অত্যুজ্জ্বল পরিবেশেই অদ্বিতীয় বিবাহোৎসবটি সম্পন্ন হয়েছিল।
এই অসাধারণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শত শত লোক ঘন্টার পর ঘন্টা এমনকি দিনের পর দিন হেঁটে এসেছিলেন। কেউ কেউ দুর্গম এবং হায়না, সিংহ ও হাতি বসবাসকারী বিপদজনক এলাকাগুলি পার হয়ে এসেছিলেন। ব্যক্তিগত মালপত্র ছাড়াও অনেক পরিদর্শনার্থী মুরগি, ছাগল ও সবজি নিয়ে এসেছিলেন। সেই গ্রামে পৌঁছানোর পর, তারা একটি উন্মুক্ত স্থানে যান যেটি সাধারণত খ্রীষ্টীয় সম্মেলনের জন্য ব্যবহার করা হত। ভ্রমণের কারণে ক্লান্ত হলেও তারা আনন্দিত ছিলেন আর যা ঘটতে চলেছে তারজন্য তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল ঐকান্তিক প্রতীক্ষাকে প্রতিফলিত করেছিল।
কারা বিবাহ করছিলেন? তারা বৃহৎ সংখ্যক ছিলেন! হ্যাঁ, শত শত দম্পতি। তারা সংবাদ শীর্ষক দখলকারী কোন গণবিবাহের অংশ ছিলেন না। এর বিপরীতে তারা ছিলেন ছলনাহীন ও উত্তম অভিপ্রায়যুক্ত দম্পতি যারা নিবন্ধভুক্তির দফতর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলিতে বাস করার কারণে পূর্বে তাদের বিবাহ নিবন্ধভুক্ত করাতে সক্ষম হননি। যিহোবার সাক্ষীদের সঙ্গে বাইবেল অধ্যয়ন করার পর এইসব দম্পতিরা বিবাহ সম্বন্ধে ঐশিক মানের প্রতি সতর্ক হয়ে উঠেছিলেন। তারা শিখেছিলেন যে তাদের সৃষ্টিকর্তা, বিবাহের উদ্যোক্তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিবাহ করা প্রয়োজন, ঠিক যেভাবে যীশুর জন্মের সময়ে যোষেফ ও মরিয়ম নিবন্ধিকরণের বাধ্যবাধকতাগুলি পূরণ করেছিলেন।—লূক ২:১-৫.
অনুষ্ঠানটির জন্য প্রস্তুতি
মোজাম্বিকে যিহোবার সাক্ষীদের শাখা অফিস সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রথমত, আইনের প্রয়োজনীয় পদ্ধতিগুলি জানার জন্য সেই দেশের রাজধানী, মাপুটোর বিচার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। পরে টেটের প্রাদেশিক অঞ্চলের রাজধানী শহরের মিশনারিরা এই ব্যবস্থাদিতে আরও সমন্বয় বিধান করার জন্য, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মিশনারি এবং নোটারি ও সরকারি শনাক্তিকরণ বিভাগের আধিকারিকদের ফিঙ্গোয়ে গ্রামে যাওয়ার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে, শাখা কার্যালয় সম্বন্ধযুক্ত সমস্ত মণ্ডলীকে নির্দেশনাদি ব্যাখ্যা করে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। সাক্ষীবৃন্দ ও স্থানীয় আধিকারিকগণ উভয়েই সেই অদ্বিতীয় অনুষ্ঠানটির জন্য আকুলভাবে প্রতীক্ষা করেছিলেন।
১৯৯৭ সালের ১৮ই মে, রবিবার সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে তিনজন মিশনারি ফিঙ্গোয়ে গ্রামে এসে পৌঁছেছিলেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আধিকারিকদের জন্য প্রশাসন ভবনের পাশেই আরামদায়ক বাসস্থান প্রস্তুত করেছিলেন। যাইহোক, পরিদর্শনকারী আধিকারিকেরা যিহোবার সাক্ষীদের আতিথেয়তায় এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তারা মিশনারিদের সঙ্গে উপস্থিতমত তৈরি কুটিরে থাকা বেছে নিয়েছিলেন। রন্ধনকারীদের মধ্যে একজন স্থানীয় মণ্ডলীর প্রাচীন ছিলেন এবং বিবাহোৎসবের প্রস্তুতির জন্য যে স্বেচ্ছাসেবকেরা অধিকতর দাসসুলভ কাজগুলি করছিলেন তাদের মধ্যে যে একজন ভ্রমণ অধ্যক্ষও ছিলেন তা জেনে তারা আশ্চর্য হয়েছিলেন। এছাড়াও তারা মিশনারিদের শান্তভাব লক্ষ্য করেছিলেন যারা কোন অভিযোগ ছাড়াই একটি সাধারণ কুটিরে রাত্রিযাপন করেছিলেন ও একটি ছোট পাত্র দিয়েই স্নান সেরেছিলেন। এইধরনের বিভিন্ন পটভূমির লোকেদের মধ্যে এমন দৃঢ়বন্ধন তারা আগে কখনও দেখেননি। কিন্তু যে বিষয়টি তাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল তা হল দেশের আইন ও ঈশ্বরের ব্যবস্থা পালন করার জন্য প্রচুর ত্যাগস্বীকার করার মাধ্যমে তাদের প্রদর্শিত বিশ্বাস।
এক আনন্দঘন উপলক্ষ
দম্পতিরা উপস্থিত হওয়া মাত্রই অবিলম্বে তারা বিবাহের প্রথম পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন: জন্মের স্বীকৃতিপত্র সংগ্রহ করা। সকলের ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য সরকারি নিবন্ধিকরণ কর্মীদলের সামনে সুবিন্যস্ত সারিতে তারা ধৈর্যপূর্বক অপেক্ষা করছিলেন। তারপর ছবি তোলার জন্য তারা আরেকটি সারিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন ও এরপর তাদের শনাক্তিকরণ কার্ড সংগ্রহের জন্য সরকারি শনাক্তিকরণ বিভাগের দলের কাছে গিয়েছিলেন। তারপর তারা অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত বিবাহ স্বীকৃতিপত্রের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য সরকারি নিবন্ধিকরণ কর্মীদলের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। এরপর মেগাফোনে তাদের নাম শোনার জন্য ধৈর্যপূর্বক অপেক্ষা করেছিলেন। বিবাহ স্বীকৃতিপত্র সংগ্রহ করা একটি আবেগপ্রবণ দৃশ্য ছিল। প্রত্যেক দম্পতি যখন মহামূল্যবান জয়ের স্মৃতিচিহ্নের মত তাদের বিবাহ স্বীকৃতিপত্রগুলি তুলে ধরেছিলেন তখন তাদের মধ্যে প্রচুর আনন্দ বয়ে গিয়েছিল।
এই সবকিছুই সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। তবুও, উপলক্ষটির আনন্দ উত্তাপ ও ধূলার দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়নি।
পুরুষেরা পরিপাটিভাবে পোশাক পরে এসেছিলেন, অনেকে কোট ও টাই পরেছিলেন। স্ত্রীলোকেরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেছিলেন, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল রং বেরঙের কাপড়ে তৈরি কোমর থেকে লম্বা পোশাক যেটিকে ক্যাপুলোনা বলা হয়। কেউ কেউ তাদের শিশুদের একইরকম পোশাক পরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন।
সবকিছু সুন্দরভাবেই এগোচ্ছিল কিন্তু একদিনে সম্পন্ন করার জন্য দম্পতিদের সংখ্যা অত্যধিক ছিল। যখন সন্ধ্যা হয়, সরকারি আধিকারিকেরা সদয়ভাবে দম্পতিদের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা মন্তব্য করেছিলেন যে “আমাদের ভাইরা” যারা সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রচুর ত্যাগস্বীকার করে এসে অপেক্ষা করছেন তাদের তারা ছেড়ে যেতে পারেন না। এই সহযোগিতা ও আত্মত্যাগের মনোভাব সর্বদা মনে রাখার মত।
রাতে তীব্র ঠাণ্ডা ছিল। যদিও কয়েকজন কুটিরে ছিলেন কিন্তু অধিকাংশ দম্পতিই বাইরে, আগুনের চারিদিকে গাদাগাদি করে বসেছিলেন। উপলক্ষের আনন্দকে তা এতটুকুও কমিয়ে দিতে পারেনি। আগুনের স্ফুলিঙ্গের শব্দের চেয়েও হাসি ও সুরেলা গানের আওয়াজ অধিকতর উচ্চ ছিল। অনেকে তাদের নব অর্জিত দলিলগুলি দৃঢ়মুষ্টিতে আঁকড়ে ধরে তাদের ভ্রমণের গল্প বলেছিলেন।
ভোরবেলা কেউ কেউ তাদের বিবাহ নিবন্ধভুক্ত করার খরচ দেওয়ার জন্য মুরগি, ছাগল ও সবজি বিক্রি করতে গ্রামের কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। অনেকে সেগুলির আসল মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে বিক্রি করার দ্বারা প্রকৃতই “ত্যাগস্বীকার” করেছিলেন। দরিদ্র লোকেদের কাছে একটি ছাগল এক মূল্যবান ও দামী বস্তু; তবুও তারা বিবাহ করে তাদের সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এই ত্যাগস্বীকার করতে ইচ্ছুক ছিলেন।
কষ্টকর ভ্রমণ
সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য কিছু দম্পতি অনেক দূর থেকে হেঁটে এসেছিলেন। শাম্বোকো ও তার স্ত্রী, হাকুলিরার ক্ষেত্রে এটি ঘটেছিল। তারা সেই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় রাতে আগুনের তাপে তাদের পা উষ্ণ করার সময় তাদের গল্প বলেছিলেন। ৭৭ বছর বয়স্ক, এক চোখ অন্ধ ও অন্য চোখে ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন বৃদ্ধ শাম্বোকো তার মণ্ডলীর অন্যান্যদের সঙ্গে, তার ৫২ বছরের বন্ধনকে আইনসংগত করার দৃঢ়সংকল্প নিয়ে তিন দিনের জন্য খালি পায়ে হেঁটে এসেছিলেন।
৭২ বছর বয়স্ক অ্যানসেলেমু কেম্বো ইতিমধ্যেই ৫০ বছর যাবৎ নেরির সঙ্গে বাস করছিলেন। ভ্রমণের অল্প কয়েকদিন আগে, তার আবাদি জমিতে চাষ করার সময় গুরুতরভাবে তার পায়ে একটি বড় কাঁটা বিদ্ধ হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত নিকটতম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাসত্ত্বেও, তিনি পায়ে হেঁটে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অত্যন্ত ব্যথা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিঙ্গোয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছাতে তিনদিন লেগেছিল। বিবাহ স্বীকৃতিপত্রটি হাতে পাওয়ার পর অ্যানসেলেমু তার আনন্দকে চেপে রাখতে পারেননি।
আরেকজন লক্ষণীয় নববিবাহিত ব্যক্তি ছিলেন একজন প্রাক্তন বহুগামী ব্যক্তি, এভান্স সিনোরিয়া। যখন তিনি ঈশ্বরের বাক্যের সত্য শিখেছিলেন, তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার বিবাহ আইনসংগত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার প্রথম স্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ও তাকে ছেড়ে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী যিনি বাইবেল অধ্যয়ন করছিলেন, তাকে বিবাহ করতে সম্মত হয়েছিলেন। সিংহ ও অন্যান্য বন্য জন্তু বসবাসকারী এক বিপদজনক এলাকার মধ্যে দিয়ে তারা দুজনে হেঁটে এসেছিলেন। তিনদিন ভ্রমণের পর, তারাও আইনত বিবাহ করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন।
মিশনারি ও আধিকারিকেরা এসে উপস্থিত হওয়ার পাঁচদিন পর, শুক্রবারে, কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে ৪৬৮টি শনাক্তিকরণ কার্ড ও ৩৭৪টি জন্মের স্বীকৃতিপত্র দেওয়া হয়েছিল। ২৩৩টি বিবাহ স্বীকৃতিপত্র প্রদান করা হয়েছিল! এক আনন্দোচ্ছল পরিবেশ বিদ্যমান ছিল। শারীরিক ক্লান্তি সত্ত্বেও, সকলেই একমত হয়েছিলেন যে তাদের প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছিল। নিঃসন্দেহে, এই উপলক্ষটি জড়িত সমস্ত ব্যক্তিদের মন ও হৃদয়ে চিরন্তন হয়ে থাকবে। সত্যই এটি অত্যন্ত অসাধারণ এক বিবাহোৎসব ছিল!